
সম্প্রতি ঢাকার ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনে একজন অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরার কারণে প্রায় ৪০ মিনিট আটকে রাখা হয়েছে । সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য তাঁর পোশাককে ‘অশালীন’ বলে আপত্তি করেছিলেন। অথচ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাত্রীদের জন্য এমন কোনো পোশাকবিধি নেই। ঘটনাটি নিয়ে তদন্তও শুরু হয়েছে।
তাহলে আমার প্রশ্ন হলো—একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হাফপ্যান্ট পরে
মেট্রোরেলে উঠলে রাষ্ট্রের আসলে কী ক্ষতি হয়?
ঠিক বলুন তো রাষ্ট্রের কোন কোন জায়গায় ব্যাথা হয়,বান্ধবী ললিতা?
আইন ভাঙলে আইন প্রয়োগ করুন। অপরাধ করলে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু কোনো লিখিত নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও একজন নাগরিকের পোশাককে ‘অশালীন’ ঘোষণা করে তাকে জনপরিসরে হেনস্তা করা কি রাষ্ট্রের কাজ?
আরেকটি ঘটনা আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে আমার মনে,
গত ৮ আগস্ট তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বৈধ পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টিকিট থাকা সত্ত্বেও নেপাল যাওয়ার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে বাধার মুখে পড়েন। তাঁদের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের অবিবাহিত হওয়া, পরিবার জানে কি না এবং অভিভাবক ছাড়া কেন বিদেশ যাচ্ছেন—এ ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল। পরে তাঁরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করে এবং আইনগত ভিত্তি ছাড়া ভবিষ্যতে তাঁদের বিদেশযাত্রায় বাধা না দিতে নির্দেশ দেয়।
এখানেও প্রশ্নটা খুব সাধারণ—একজন প্রাপ্তবয়স্ক, বৈধ কাগজপত্রধারী নারী অবিবাহিত বলে একা বিদেশে যেতে চাইলে রাষ্ট্রের
সমস্যা কোথায়?
সে কি নিজের পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারবে না?
সে কি নিজের টাকা দিয়ে ভ্রমণ করতে পারবে না?
তার কি বিদেশ যাওয়ার জন্য অবশ্যই স্বামী, বাবা, ভাই কিংবা কোনো পুরুষ অভিভাবক লাগবে?
একজন নারী বিবাহিত হলেই যদি স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করতে পারেন, তাহলে অবিবাহিত হলেই কেন তাঁর স্বাধীনতা কমে যাবে?
নারীর স্বাধীনতা কি বিয়ের সনদের ওপর নির্ভরশীল?
আমার প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ সদস্যকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও বড়—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
দেশের মানুষ যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন দুর্নীতি বন্ধে আমরা কতটা কঠোর?
মানুষ যখন নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, তখন অপরাধ দমনে আমরা কতটা কার্যকর?
তরুণদের যখন চাকরি দরকার, তখন কর্মসংস্থান নিয়ে আমাদের অগ্রাধিকার কতটা?
মানুষ যখন বিদেশে যাওয়ার বৈধ সুযোগ খুঁজছে, তখন ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে আমরা কতটা মনোযোগী?
আর একজন ছেলে হাফপ্যান্ট পরলেই যদি সেটি বড় সমস্যা হয়ে যায়, কিংবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত নারী একা বিদেশে যেতে চাইলেই যদি
তার বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে আমাদের নিজেদের কাছে একটা প্রশ্ন করা
দরকার:
রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করবে, নাকি নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক ও স্বাধীনতার পাহারাদার হয়ে উঠবে?
রাষ্ট্রের কাজ মানুষের পোশাকের দৈর্ঘ্য মাপা?
রাষ্ট্রের কাজ হলো—নিরাপত্তা দেওয়া, আইন প্রয়োগ করা, দুর্নীতি দমন করা, অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা।
একজন মানুষ কী পোশাক পরবে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কাকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করবে—এসব বিষয়ে সামাজিক মতামত থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে থাকতে হবে স্পষ্ট আইন, নির্দিষ্ট বিধি এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান।
লেখক : অ্যাক্টিভিস্ট,কলাম লেখক,শিক্ষার্থী